A Christmas Gift
এই কিছুদিন আগে, রুপকথার রাজ্যে জন্ম হল এক রঙ পেন্সিলের। কী মসৃণ কাঠের শরীর তার! নীল রঙের এক চিলতে রবার লাগানো নীচে। তবে দেখার মত হল তার শীষ। লাল, নীল, সবুজ থেকে শুরু হয়ে হলুদ, গোলাপী- কি নেই সেখানে!
রঙ পেন্সিলের মনে ভারি আনন্দ। ছোট্ট নীল সাইকেলে চেপে নানান জগৎ ঘুরে বেড়ায় সে। যেখানেই সে যাক না কেন, এক কোণে একটু করে ছবি এঁকে রেখে আসে। সেদিন কমলার বনে একটা বেগুনি পাখি এঁকে দিয়েছিল- এরপর চশমার দোকানে গিয়ে আঁকল ধূসর রঙের মস্ত হাতি- দোকানির মুখের হা'তে মাছি ঢুকে গেল। তবু পেন্সিল থামে না।
একদিন হুট করে লম্বা চুলঅলা এক ছোট্ট ছেলে খেলতে খেলতে খুঁজে পেল তাকে। পেন্সিল এত পছন্দ হল তার- হাত থেকে আর নামাতেই চায় না। শেষমেষ খেলার চোটে টেবিলে চাপ লেগে পেন্সিলের অত স্বাধের শীষ গেল ভেঙে। ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল পেন্সিল। অদ্দুর হলেও হত- পেন্সিল আর রঙ করতে পারছে না দেখে দুষ্টু ছেলেটা হাঁটুর ভাজে রেখে দিল এক চাপ। ভেঙে অর্ধেক হয়ে যাওয়া অর্ধচেতন পেন্সিলকে ছুঁড়ে ময়লার বিনে ফেলে দিল বাচ্চা ছেলেটা।
সারা শরীরে ব্যথা নিয়ে যখন পেন্সিল চোখ মেলল, শুনল এক গলা বিষাদ নিয়ে কে যেন গাইছে। ভেঙে যাওয়া টুকরো কাঠের ব্যথায় পেন্সিল ঠিকমত শুনতে পারছে না- কিন্তু গানের শব্দ যেন আস্তে আস্তে করে তার বেদনায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। বহুক্ষণ পর যখন একটু ধাতস্থ হল- কোনমতে মাথাটা উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল সে-
"কে তুমি ভাই, অমন করে গান গাইছ?"
অমনি গানের শব্দ গেল থেমে, কিছু ঝটপট আওয়াজও শুনতে পাওয়া গেল। মুহুর্ত পর ঘন কালো, জিজ্ঞাসু দুটো চোখ এসে স্থির হল পেন্সিলের মুখের ওপর,
"আমি কর্কশ কাক, তুমি কে?"
"আমি রঙ পেন্সিল...কর্কশ তোমার নাম?" - জিজ্ঞেস করল থতমত পেন্সিল।
কিছুক্ষন নীরব থেকে চোখ তুলল আবার কাক, -"আমার গাইতে ভাল লাগে, কিন্তু কোকিলের মত গলা নয় বলে আমি আমাকে কর্কশ ডাকি।"
"উহ!"- কোকিলের কথায় দুহাতে কান চাপল রঙ পেন্সিল। "ভাগ্যিস তুমি কোকিলের মত নও। ওর গলা বড় বেশি মিষ্টি। "
অবাক চোখে তাকায় কাক।
- "কিন্তু সবাই যে কোকিল ভালবাসে!"
- " বারে, আমিও তো সবাই। আমি তো বাসি না। যদিও তোমার স্বর আমার ব্যথায় আদর দিচ্ছে।"
এতক্ষণে কাক দেখতে পায় রঙ পেন্সিলকে কে যেন ভেঙে রেখেছে।
-"কীভাবে হল এসব?", পাখা ঝাপটে জিজ্ঞেস করে কাক।
এ কথায় ফোঁপানো শুরু হল পেন্সিলের, "দুষ্টু ছেলেটা- হুঁউউ- যাচ্ছিলাম পরগাছার ওখানে- মাঝপথে, হুঁউউ- আমাকে- ভেঙে ফেলেছে..."- কোনমতে এটুকু বের হল ভাঙা রঙ পেন্সিলের মুখ থেকে।
মাথা চুলকালো কাক- "দুষ্টু ছেলেটা কোথা থেকে আসল? আর, পরগাছাটা আবার কে?"
ফোঁপাতে ফোঁপাতেই চোখ কপালে ওঠে পেন্সিলের।
-"সারা জগৎ উড়ে বেড়াও তুমি,আর পরগাছা কে চেন না?"
জঙ্গলের ধার দিয়ে বয়ে গেছে যে নদী- তার পারে পরগাছার বাড়ি। পরগাছা যখন এই বুড়ো আঙ্গুলটার সমান ছোট, তখন সকলে খুব করে বলল-
"তোমার দরকার এক বড় গাছ।"
সেও সেইমত খুঁজেপেতে বের করল লম্বা-চওড়া পুরুষ্টু এক গাছ। গাছ কিন্তু পরগাছাকে দেখে একটুও খুশি হল না। শেকড় সিঁটকে বলল,
-"এমা, পরগাছা!"
পরগাছা মনের দুঃখে পরদিন নদীর ধারে পথ বাওয়া শুরু করল। দিন যায়, বছর যায় - পরগাছা মাটি বেয়ে বেয়ে চলে, বাড়ে কি বাড়ে না। নদীর ধারে সন্ধ্যা নামার আগ দিয়ে যখন খুব অন্ধকার নেমে আসে- এমন একদিন পরগাছা গেল হারিয়ে। অন্ধকারে হারিয়ে গিয়ে পরগাছা যখন খুব কাঁদছে- তখন সে হুট করে দেখল নদীর ধার বেয়ে এক আজব পেন্সিল হিজিবিজি কি সব এঁকে যাচ্ছে -কোন আলো ছাড়াই। এভাবেই পরগাছার দেখা এই রঙ পেন্সিল এর সাথে। সেদিনের সেই বুড়ো-আঙুলে পরগাছা ফুলে ফেঁপে এখন কি যে এক রাজত্ব বানিয়ে রেখেছে, কত ধরণের পোকা মাকড়- কত ধরণের পাখি এসে গান করে সেখানে।
একটুখানি দম নিয়ে পেন্সিল বলে, "আমি তো মাঝে মাঝেই পরগাছার পাতায় আঁকতে যাই।" বলেই বিষণ্ণ হয়ে যায় ছোট্ট পেন্সিল। ওর শীষটা ভেঙে কাঠের এতো ভেতরে ঢুকে গেছে- আর কখনো আঁকতে পারবে বলে বিশ্বাস হয় না।
জীবন অদ্ভুত। কেউ ছুঁড়ে ফেলে, আর কেউ কুড়িয়ে তোলে। কাক চুপচাপ বসে থাকে পেন্সিলের পাশে। অল্প কথাতেই ক্লান্ত হয়ে গেছে রঙ পেন্সিল। ব্যথায় গুঙিয়ে উঠে সে যখন আবার ঘুমিয়ে পরে- কাক তখন পেন্সিলকে ঠোঁটে করে নিয়ে উড়াল দেয় অনেক উঁচুতে। প্রথমেই নদীটাকে খুঁজে বের করে সে। এরপর নদী বরাবর আস্তে আস্তে এগুতে থাকে।
উঁচু থেকে সবকিছু এক নজরে দেখা যায় বলে জগৎটাকে বড় আপন লাগে। পাশাপাশি বেশ কিছু জায়গা জুড়ে বিভিন্ন পরগাছারা নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। কিছু গাছ বেয়ে উঠেছে, কিছু নদীর ধার বেয়ে- কিছু গভীর জঙ্গলের মাঝে ছোট ছোট দ্বীপমতন করে ফেলেছে। কাক নদী বরাবর ঝোপগুলোর ওপর চক্কর দেয়, প্রথম তিনটে পেরিয়ে চতুর্থ ঝোপে যাওয়া মাত্র কাক বুঝতে পারে- এটিই পেন্সিলের বর্ণনা করা পরগাছার ঝোপ। তার পাতায় পাতায় কিম্ভূতকিমাকার সব ছবি। গোলাপী হাতি, নীলচে শেয়াল, চার-পাঁচটা পাতা মিলিয়ে খাম্বার মত কি একটা আঁকা। আর একটু কাছে আসতেই কাক তব্দা খেয়ে যায়- কী নেই সেখানে! ক্ষুদে ক্ষুদে গুবড়ে পোকারা গম্ভীর মুখে হাঁটাহাঁটি করছে- একটু বামে টিকটিকি তার পরিবার সমেত হুরপার করে কোথায় যাচ্ছে।
পরগাছা গভীর স্নেহে পিঁপড়েদের লেফট রাইট দেখছিল। পেন্সিলের অবস্থা থেকে আঁতকে ওঠে সে- উলটে পালটে, এপাশ থেকে ওপাশ থেকে রঙ পেন্সিলকে পরীক্ষা করে দেখে। এরপর কাকের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে বলে, -"তোমার ঠোঁট বেশ ক্ষুরধার মনে হচ্ছে?"
থতমত খেয়ে কাক বলে ওঠে, "বিশ্বাস করো...দুষ্টু ছেলেটা...আমি গান গাইছিলাম- পেন্সিল খুঁজে পেল..."-হেসে ওঠে পরগাছা, "আমি ভাবছিলাম খোদাই করতে কতটুকু পটু তুমি।" পেন্সিলকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে পরগাছা- আর কাক তার ক্ষুরধার ঠোঁট দিয়ে একটু একটু করে ভেঙে যাওয়া কাঠ খোদাই করতে থাকে।
যতক্ষণে পেন্সিলের ঘুম ভাঙে, কাক ততক্ষণে তার কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে। ভেঙেচুরে যাওয়া কাঠের মসৃণ দেহের মাঝ থেকে অল্প অল্প উঁকি দিচ্ছে রঙধনু রঙা পেন্সিলের শীষ। পেন্সিল আস্তে আস্তে তা স্পর্শ করে- বিশ্বাস হয় না তার- হলদে রঙের খুশি উপচে পরে তার চোখ থেকে। এমনিতে পেন্সিলের কথার অভাব হয় না- কিন্তু এখন তার ঠোঁট কাঁপছে,আর চোখ দিয়ে সমানে লাল, নীল, বেগুনী পানি ঝরছে।
এতক্ষণে কাকের দিকে নজর দেবার ফুরসৎ মেলে পরগাছার, "তা, তোমার শেকড় কোথায়?"
কাক খানিকক্ষণ চিন্তা করে বলে, "আমার তো শেকড় নেই, কেবল ডানা আছে।"
পরগাছা মাথা চুলকে বলে, "তা তুমি থাকো কোথায়?"
কাক নীচুস্বরে জবাব দেয়, "আমি উড়ে বেড়াই।"
কাকের ছিল এক পর্বতমালা। পর্বতের চূড়ায় হিম জমিয়ে মা বসুন্ধরা যখন ছবি আঁকত, কাক তখন মহা আনন্দে বন্ধু ফিঙে কে গান গেয়ে শোনাত। আচমকা একদিন ফিঙের মনে হল, -"না আমি কাকের মত গাইতে পারি, না পারি হিমছবি আঁকতে। সব ফিঙেই গান করে, আমি কেন পারি না?" কাকের সুর সেদিন তার কানে বিদ্রুপের মত ঠেকল। কাক যতই বোঝাক, ফিঙের কিছু এলো গেল না। উলটো অক্ষম রাগে জ্বলেপুড়ে কাককে সে কর্কশ বলে খুব গালমন্দ করল। পরদিন নীলচে কালো ল্যাজ দুলিয়ে ফিঙে দিল উড়াল। সেই থেকে কাক পর্বত ছেড়ে বন জঙ্গলে একা একা গান গায় আর সঙ্গীর খোঁজে উড়ে বেড়ায়।
এই শুনে অবাক হয়ে পরগাছা শুধোয়, "তোমার ক্লান্ত লাগে না?"
কাক কাঁধ নিচু করে, "লাগে, বড় ক্লান্ত লাগে।"
"তুমি এখানে এসে মাঝে মাঝে জিরোলেই পারো, পরগাছার এখানে কত ছায়া"-বলে ওঠে ভাঙা রঙ পেন্সিল। আসলে রঙ পেন্সিল কিছুতেই চাইছিল না কাক আবার উড়াল দিক। অমন বিষাদ ভরা গানের গলা যার, তার ক্লান্তি কমাতে যত ছবি আঁকতে হয়, পেন্সিল আঁকবে। পরগাছাও মাথা নাড়ায়, এতদিনে সেও জেনেছে চাইলেই তার ছায়ার তলে বাস করতে পারে আস্ত এক জগৎ।
এরপর বহুদিন গেছে। ততদিনে পরগাছা বেড়েছে বহুদূর। ভাঙা রঙ পেন্সিল পরগাছা আর কাকের গায়ে উদ্ভট সব ছবি আঁকে, ক্লান্ত কর্কশ স্বরে কাক মাঝেসাঝে গান শোনায়, আর পরগাছা এদেরকে তার ডালপালায় জড়িয়ে নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুম যায়।
নদী তখনও কলকল করে বইতে থাকে।
____________________________________
Comments
Post a Comment