ক্লাস নাইন বা টেনে কলেজের লাইব্রেরি তে একটা হলুদ রঙের বই খুঁজে পেলাম। নাম, লেখিকার নাম কিচ্ছু মনে নেই এখন। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কাহিনী, জার্নালের মত লেখা, তবে একদমই জার্নাল নয়। ভদ্রমহিলা সম্ভবত জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার স্ত্রী ছিলেন। তাঁর লেখার হাত আমাকে খুব টেনেছিল। সহজ, সরল, ছিপছিপে ভাষা। খুব সহজ গলায় বর্ণনা করে যাচ্ছেন কি হচ্ছে, কি হচ্ছে না।
বইটা আমার মনে দাগ কাটার মূল কারণ ছিল বইতে বর্ণিত সেই সময়ের ঢাকার পরিস্থিতি। যুদ্ধ সম্বন্ধে ততদিনে আমার আগ্রহের বয়স এসে গেছে, নানাবিধ বই পড়ি, নানাবিধ বই পড়ার চেষ্টা করি কিন্তু ধৈর্য্য কুলায় না। সব মিলিয়ে যুদ্ধ (যেকোন যুদ্ধ) সমন্ধে আমার ধারণা জন্মাল, যে সারাক্ষণ গোলাগুলি চলছে, সারাক্ষণ বোমা ফুটছে, লাশ পরে আছে। এর মাঝে মাঝে যে দোকানও খুলছে, মানুষজন খাওয়াদাওয়া করছে, রাস্তায় গাড়ি চলছে, রিকশা চলছে - সে সম্বন্ধে প্রথম ধারণা আসল গুহঠাকুরতার লেখা পড়ে৷ এর মাঝেই তিনি বলে যাচ্ছেন শেরাটনে ফরেনারদের জমা হওয়ার কথা, বোমা হামলা, গুলিবর্ষণ ইত্যাদি।
______________________________________________
ছোটবেলায় নানা নানু প্রায়ই আমাদের বাসায় বেড়াতে আসতেন। প্রায়ই আমার স্মৃতিতে ভাসে, রাতের বেলা লাইট বন্ধ করে আমরা ভাইবোন নানা নানুর চারপাশে বসে বসে গল্প শুনছি। নানা প্রায়ই মুক্তিযুদ্ধের গল্প করতেন আমাদের। আমার এখনো মনে আছে, আমি আবদার জানানোর জন্য যখন বলছি, গল্প বলো গল্প বলো, মুক্তিযুদ্ধের গল্প বল - নানা কিছুটা অসহিষ্ণু গলায় বলছেন, এগুলা গল্প না আপু, সত্যি ঘটনা।
নানার কাছেই প্রথম শোনা বিহারি দের মেরে গলা কেটে ফেলে রেখার ঘটনা। বাংালিদের লুটতরাজ। নিজের কোটের সাথে হ্যান্ডশেক করার কাহিনী। আরেক বাসায় গিয়ে নিজের টিপট থেকে চা খেয়ে আসা। এইসব ঘটনা আমাদের শৈশব এর হাসির খোরাক ছিল।
______________________________________________
চোঙা নল দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ দেখার বহুদিন পেরিয়েছে। যত সামনে যাই, আরও কত কিছু দেখা হয়। এতে করে কি গৌরব কমে বা বাড়ে? যুদ্ধ যে গৌরবের না, তা বুঝতে ২০০৯ পার হওয়া লাগল, ২০১৩, ২০১৫ পার হওয়া লাগল। এখন ২০২৫ এর শেষে এসে দেখি - যত বড় হচ্ছি, না বোঝার পরিধি আরও বাড়ছে। অন্য শব্দে, যত বড় হচ্ছি বয়সে, তত যেন ছোট হচ্ছি।
______________________________________________
অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরির সেই বড় সাহেব, "সাঈদ, কোথায় যাচ্ছ তুমি, তোমাকে খুঁজছি আমি" বলে ধমকে ওঠা- নানাকে বাঁচিয়ে নেয়া সেই ভদ্রলোকের কথা মনে পরে। সেও পাকিস্তানের, নানার কলার ধরে থাকা মানুষটাও পাকিস্তানের। কাকে ঘৃণা করি? ব্লগারদের কাছে শিখলাম পাকিস্তানকে ঘৃণা করতে হবে। ভারতকেও ঘৃণা করতে হবে। কানাডার জীবন তখন দূরে বসে মুচকি হাসছে, সময় মত দেখিয়ে দিল সেজান জুস কিংবা ম্যাকডোনাল্ডস বাদ দিলে ঘরের পাশের রহিম সাহেবকেই ভাতে মারলাম - আমিই। নওয়াজ শরীফের তাতে কিচ্ছু যাবে আসবেনা। শায়েরি বাদ দিলে, গালিবের কিবা আসে যায়।
Comments
Post a Comment